‘আমি আর নীরব থাকতে পারছি না’—গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরতার সাক্ষী হওয়ার দাবি ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | জাতিস্বর
গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন, নির্বিচার গোলাবর্ষণ, নারী-শিশু হত্যা এবং মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর হামলার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার দাবি করেছেন আভদার শাইলোভস্কি (Avdar Shailovski) নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) একজন মেজর হিসেবে পরিচয় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, পাঁচ বছর সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের পর বিবেকের তাড়নায় তিনি ইসরায়েল ছেড়ে পোল্যান্ডে চলে গেছেন।
‘আমি আর নীরব থাকতে পারছি না’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড, ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ, গাজায় পরিচালিত সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলি সমাজে ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
বক্তব্যটি ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পোল্যান্ডের একটি ওয়েবসাইটেও পুনঃপ্রকাশিত হয়। একই বক্তব্য নিয়ে স্পেনের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান Maldita.es-এ ২৬ অক্টোবর একটি যাচাইয়ের আবেদন নথিভুক্ত হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় ও সামরিক বাহিনী ত্যাগের দাবির স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
পাঁচ বছরের সামরিক জীবন, বিবেকের তাড়নায় সেনাবাহিনী ত্যাগ
প্রচারিত বক্তব্যের শুরুতে ওই ব্যক্তি লিখেছেন, তিনি আভদার শাইলোভস্কি, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন মেজর। পাঁচ বছরের সামরিক জীবনে নিজের চোখে দেখা বিভিন্ন অপরাধের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে থেকে যেসব কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন, সেগুলো তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। নিজের মানবিকতা ও বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি আরও লিখেছেন, নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ না করলে সেই ঘটনাগুলো তাঁকে ভেতর থেকে শেষ করে দেবে। অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধবোধে ভুগছেন এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।
গাজায় তাঁবু, বেকারি ও ত্রাণকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ
গাজায় দায়িত্ব পালনকালে সবচেয়ে ভয়াবহ যেসব ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়স্থলে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণ।
তাঁর অভিযোগ, একজন ট্যাংক কমান্ডার নিজের কামান দিয়ে যেন খেলায় মেতে উঠতেন। তাঁবুর ভেতরে গাদাগাদি করে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গোলা ছোড়া হতো।
শুধু আশ্রয়শিবির নয়, বেকারির সামনে রুটির জন্য অপেক্ষমাণ মানুষ এবং খাদ্য ও মানবিক সহায়তা বিতরণকারী যানবাহনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ওপরও গোলাবর্ষণের ঘটনা দেখেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, বিমান থেকে জনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হতো। মুহূর্তের মধ্যে ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো এবং ভেতরে থাকা নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়তেন।
ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা নারী-শিশুদের গুলি করার অভিযোগ
বক্তব্যের আরেকটি মর্মান্তিক অংশে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর স্নাইপাররা মানবিক সহায়তা পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের গুলি করে হত্যা করতেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডকে কিছু সেনা সদস্য বিনোদনের মতো করে দেখতেন।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার সংগ্রহের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার অপরাধে কীভাবে তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া সম্ভব? মানবিকতার কোনো মূল্য কি অবশিষ্ট নেই?
মায়ের লাশের পাশে রক্তমাখা রুটি হাতে শিশুর কান্না
নিজের বক্তব্যে তিনি একটি শিশুর হৃদয়বিদারক দৃশ্যের কথাও তুলে ধরেছেন।
তাঁর দাবি, এক শিশু তার মৃত মায়ের পাশে বসে রক্তমাখা বাসি রুটির একটি টুকরো আঁকড়ে ধরে কাঁদছিল। অথচ আশপাশের কিছু সেনা সদস্য শিশুটির অসহায়ত্ব দেখে হাসাহাসি করছিলেন।
এই দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও জলপাইবাগান ধ্বংসের অভিযোগ
গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
তাঁর দাবি, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের জলপাইগাছ উপড়ে ফেলতে, কৃষকদের ওপর হামলা চালাতে এবং তাঁদের নিজস্ব জমিতে কাজ করতে বাধা দিতে দেখেছেন।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
একটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, একজন ফিলিস্তিনিকে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে বাড়ির ছাদে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্যথায় পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থায়ই বাড়িটি ধ্বংস করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
লোকটি ছাদে উঠে সাদা কাপড় নাড়াতে শুরু করলে একজন ইসরায়েলি সেনা তাকে গুলি করে হত্যা করেন বলে ওই বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করার অভিযোগ
আভদার শাইলোভস্কির নামে প্রচারিত বক্তব্যে ইসরায়েলি সমাজ ও সামরিক বাহিনীর একটি অংশের মানসিকতারও সমালোচনা করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, তাঁদের শেখানো হয়েছিল আরবরা নোংরা, বর্বর, চরমপন্থী এবং হত্যাকারী। আরও শেখানো হয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সদয় আচরণ করলে তারা ইহুদিদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে।
তিনি বলেন, সহকর্মীদের কাছে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানবিক আচরণের কথা বললে তাঁকে কাপুরুষ ও দুর্বল বলে উপহাস করা হতো।
এমনকি তাঁর সহকর্মীরা মনে করতেন, একজন ইহুদির মধ্যে আরবদের হত্যা করার এবং তথাকথিত প্রতিশ্রুত ভূমি থেকে তাদের নির্মূল করার আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত।
নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা
বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী হিসেবে উপস্থাপনের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন লেখক।
তাঁর অভিযোগ, গাজায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তার সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সামরিক নেতৃত্বের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব আগে থেকেই অবগত ছিল এবং ঘটনাটি ঘটার জন্য অপেক্ষা করেছিল।
তবে ৭ অক্টোবরের হামলা সম্পর্কে এই পূর্বজ্ঞান ও পরিকল্পনার অভিযোগের পক্ষে বক্তব্যটিতে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
ইসরায়েল ছেড়ে পোল্যান্ডে যাওয়ার দাবি
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি জানান, ইসরায়েল ছেড়ে পোল্যান্ডে যাওয়ার পর নিজেকে নিরাপদ মনে করেছেন। পোল্যান্ডকে তিনি নিজের পূর্বপুরুষদের দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক অধিকারের নামে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার ধারণা নিয়ে এখন তাঁর গভীর উপলব্ধি তৈরি হয়েছে।
তাঁর মতে, ইহুদি জনগণকে যে প্রতিশ্রুত ভূমির ধারণা শেখানো হয়েছে, সেটিকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
বক্তব্যের শেষাংশে ওই ব্যক্তি ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও নৃশংসতার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার জন্য তিনি অনুতপ্ত। মুসলমানরা যেভাবে সৃষ্টিকর্তাকে পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু বলে সম্বোধন করেন, সেই ক্ষমা ও রহমতের আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
শেষে তিনি সত্য, ভালোবাসা ও শান্তির পথে ফিরে আসার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, আবাসিক এলাকা ধ্বংস এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফিলিস্তিনি জনগণের নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণের দাবি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকে উঠে এসেছে।
আভদার শাইলোভস্কির নামে প্রচারিত বক্তব্যটি এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ও সামরিক বাহিনী ত্যাগের ঘটনা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়ায় বক্তব্যটির নির্দিষ্ট দাবিগুলো যাচাই করা জরুরি।



